সরোয়ার হোসেন :
সন্তানের মত করেই আদর স্নেহ আর যন্ত করে ধীরে ধীরে গড়ে তুলেছিলেন ৭’শ পিলি পানবরজ। মন ভরানো, প্রান জুড়ানো পান বরজ যেন আশা জাগিয়েছিল ভাগ্যের চাকা ঘুরানোর। অধিক কষ্ট করে পান বরজ আগলে রেখেছিলেন। পারিবারিক চাহিদা মেটানোর জন্য ৩/৪ দিন পান বিক্রয়ও করেছিলেন। কুষ্টিয়ার ভেড়ামারার অসহায় টিপু স্বপ্ন দেখেছিলেন, এবারের পান বিক্রয়ের টাকা দিয়ে পাড়ি দেবেন ইউরোপের পোলান্ডে। এখন একটু কষ্ট করে, খেয়ে না খেয়ে দিনাতিপাত করছিলেন। রোজার ঈদের পরই একটু বেশি দামে বিক্রি করবেন পান। ভাগ্যের চাকা ঘুরিয়ে সামাজিক ভাবে প্রতিষ্টা লাভ করবেন। কিন্তু টিপু’র সে স্বপ্ন পুড়ে গেছে আগুনে। গত রবিবার ভয়াবহ আগুন ট্রেজেডিতে সব কিছু শেষ হয়ে গেছে তার। এক নিমিষেই চোখের সামনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ৭ বিঘা জমির উপর প্রতিষ্ঠিত ৭০০ পিলি পানের বরজ। আগুনের কাছে অসহায় আত্মসমর্পন করে এখন নির্বাক হাবিবুর রহমান টিপুর পরিবার। টিপুর মতই ভাগ্যে পুড়ে ছাই হয়ে গেছে ভেড়ামারা উপজেলার ৫টি গ্রামের কয়েক হাজার যুবকের।
গত রবিবার সকাল ১১টার দিকে ভেড়ামারার রায়টা গ্রামের পাথরঘাটা এলাকায় প্রথমে আগুনের সূত্রপাত হয় পান বরজে। হালকা বাতাস আর শুষ্ক মৌসুমের কারনে দ্রুত আগুন ছড়িয়ে পড়ে। পড়ে তা ভয়াবহ রুপ নেয়। প্রায় ৪ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে আগুন ছড়িয়ে পড়ে পুড়ে ছাই করে ফেলে পান বরজ, ফসলী জমি, বসতবাড়ি, কলাবাগান সহ সব কিছু। হাজার হাজার মানুষ মুহুর্তেই ধনী থেকে ফকির হয়ে যায়। এক নির্মম বেদনাদায়ক অগ্নিকান্ডের স্বাক্ষী হয় ভেড়ামারাবাসী। হাজার যুবকের মতো আগুনে পুড়ে যায় অসহায় হাবিবুর রহমানেরও স্বপ্ন।
কুষ্টিয়া জেলার ভেড়ামারা উপজেলার বাহাদুরপুর ইউনিয়নের আড়কান্দি গ্রামের মৃত সিরাজ প্রমানিকের পুত্র টিপু। ভাগ্য বিতাড়িত সহায় সম্বলহীন হাবিবুর রহমান টিপু ভাগ্যের চাকা কি ভাগে ঘুরাবেন এমন ভাবনাতেই যখন দিশেহারা তখন তিনি পান বরজ করার সিদ্ধান্ত নেন। ৫ বছর আগে স্থানীয় এনজিও থেকে ঋন নিয়ে পান বরজ গড়ে তোলার কাজে হাত দেন। সঙ্গী হোন দুই ভাই লেবু এবং শাহাবুল। প্রতি বিঘা জমি ৩০ হাজার টাকা ব্যায় করে অন্যের জমি খাজনা নেন। ধীরে ধীরে একে একে গড়ে তোলেন ৭ বিঘা জমিতে ৭০০ পিলি পানের বরজ। জীবন মরনের আশা এবং কেন্দ্রবিন্দুতে পরিনত হয় পান বরজ। ৩ ভাইয়ের হাড় ভাঙ্গা খাঁটুনিতে মন ভরানো পানবরজ গড়ে উঠে। পানবরজ থেকেই যা আয় হতো, তাই দিয়েই চলতো ৩ ভাইয়ের যৌথ পরিবার। টিপু জানান, ইউরোপ যাওয়ার স্বপ্নে বিভর ছিলাম। স্বপ্ন দেখেছিলাম আমি পোলান্ড যাবো পান বিক্রিয়ের টাকা দিয়ে। আর ছোট ভাইয়ের জন্য করে দিবো গ্রামেই মুদি খানার দোকান। সে লক্ষ্য নিয়েই পান বরজ গড়ে তুলেছিলাম সন্তানের মত করেই আদর , যন্ত করে। কিন্তু আগুন কেড়ে নিয়েছে সব কিছু। ভয়াবহ আগুন ট্রেজেড্রিতে হাজার হাজার কৃষকের পান বরজের মতো আমার ৭ বিঘা জমির পান বরজও নিমিষেই ছাই হয়ে গেছে। লেলিহান আগুনের কাছে পরাস্ত হয়েছি। দূরে দাঁড়িয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করার ছিল না। এখন ৮ সদস্যের পরিবার কিভাবে চলবে সে ভাবনাতেই চোখে পানি চলে আসছে বলেই কেঁদে ফেলেন টিপু। ২ মেয়ে, বৃদ্ধ মা, স্ত্রী, ভাইদের নিয়েই সংসার টিপুর। আগুনের লেলিহান শিখা তাদের জীবন এলোমেলো করে দিয়েছে। ব্র্যাক স্কুলের প্রথম শ্রেনীতে এবং রায়টা স্কুলের ৫ম শ্রেনীতে পড়ে টিপুর ২ মেয়ে। জীবন কিভাবে চলবে তারই দিশা পাচ্ছেন না অসহায় টিপু।
স্থানীয়দের দাবীতে আগুনে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের পাশে সরকারের পাশাপাশি স্থানীয় বৃত্তবানদের এগিয়ে এসে কৃষকদের ঘুরে দাঁড়ানোর পথ দেখানো।